কাজী শেখ রেয়াজউদ্দীন আহমদ উত্তরবঙ্গ তথা অবিভক্ত বাংলার কীর্তিমান পুরুষ। তাঁর সময়কাল ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষ এবং তারই ছত্রছায়ায় সামন্তবাদী বঙ্গদেশ। উনিশ শতকের শোষণ, নিপীড়ন, শিক্ষাহীনতা ও সর্বোপরি মুসলিম সমাজের পশ্চাদপদতার প্রেক্ষাপটে তিনি নিয়েছিলেন অগ্রবর্তী সমাজ সংস্কারকের ভূমিকা। সামন্তবাদী সমাজপ্রভু জমিদারদের করের বোঝা থেকে গরীব-দুঃখী প্রজাদের রক্ষার জন্য ১৩১৪ বঙ্গাব্দে জমিদারদের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন শুরু হয়, এর নেতৃত্ব দেন শেখ রেয়াজউদ্দীন।
অন্যদিকে তাঁর কর্ম ও সংস্কৃতি সাধনার বড় অবদান হচ্ছে বিশাল এক ঐতিহাসিক গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ। স্যার সৈয়দ আমীর আলীর ‘এ শর্ট হিস্ট্রি অব দি সারাসিনস’ নামক বিখ্যাত গ্রন্থের সফল ও সার্থক অনুবাদক তিনি। যে মুসলমানগণ এককালে সমস্ত ইউরোপ ও উত্তর আফ্রকিায় প্রভুত্ব¡ ও প্রভাব বিস্তার করেছিল, তাদের ক্ষমতা ও সভ্যতার ইতিহাস লিপিবদ্ধ হয়েছে এই গ্রন্থে। বাংলার বহু পত্রপত্রিকা ও সৈয়দ আমীর আলী স্বয়ং এ গ্রন্থকে উচ্চমানের অনুবাদ হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। এই কঠিন কাজ তিনি কেন করেছেন? করেছেন মুসলিম সমাজকে শিক্ষিত করতে, আলোকিত করতে, ইতিহাস সচেতন করতে।
এছাড়া ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে লন্ডন ও আলীগড় থেকে প্রকাশিত Sir Thomas Walker Arnold এর ‘The Preaching of Islam’ গ্রন্থের বঙ্গানুবাদ করেছেন তিনি। বাংলায় গ্রন্থটির নামকরণ করা হয়েছিল ‘ইসলাম প্রচারের ইতিহাস’। তাঁর রচিত অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে তুরস্কের ইতিহাস, জীবহত্যা ও গো-কোরবানি, মহাত্মা স্যার সৈয়দের সুবৃহৎ জীবনী, মালেকা (উপন্যাস) ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। সাহিত্যক্ষেত্রে অসাধারন অবদানের জন্য তাঁকে ‘সম্মানসূচক ফেলোশীপ’ তথা আজীবন সদস্যপদ প্রদান করে বাংলা একাডেমি। তদানীন্তন পাকিস্তান সরকারও দেয় তমঘা-ই-মজলিস খেতাব।
বিদেশি শাসনের বিরুদ্ধে লড়তে প্রয়োজন বলিষ্ঠ শরীর ও চরিত্র গঠনের। সেদিকেও সজাগ ছিলেন তিনি। নিয়মিত শরীর চর্চা ও লাঠি খেলার মাধ্যমে হয়ে ওঠেন সুঠামদেহী অপ্রতিদ্বন্দ্বী লাঠিয়াল। যার সুবাদে ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত নিখিল বঙ্গ লাঠিয়াল সমিতির সভাপতি হন তিনি। তীব্র সমাজ সচেতন রেয়াজউদ্দীন কত কর্ম, কত সংগ্রাম করে গেছেন তা অনেকটাই আজ বিস্মৃত। ইতিহাসে স্বীকৃত এই হিরন্ময় ব্যক্তিত্ব আমাদের গৌরবময় ঐতিহ্য।
উত্তরবঙ্গের মুকুট রত্ন তথা অবিভক্ত ভারতের শ্রেষ্ঠ লাঠিয়াল গুরু এই মানুষটির জীবনীকাহিনী নিয়ে রচিত ‘বাংলার গর্ব কাজী শেখ রেয়াজউদ্দীন আহমদঃ ইতিহাসবিদ, সমাজ সংস্কারক ও অবিভক্ত ভারতের কিংবদন্তি লাঠিয়াল’। লিখেছেন তার নাতী ডা. মোহাম্মদ শফিউল হক।




Reviews
There are no reviews yet.